আতুম | |
---|---|
![]() আতুম, জগৎ-সৃষ্টি সম্পূর্ণকারী | |
প্রধান অর্চনাকেন্দ্র center | হেলিওপোলিস |
ব্যক্তিগত তথ্য | |
সঙ্গী | ইউসাসেত[১] বা নেবেথেতেপেত[২] |
সন্তান | শু ও তেফনেত |
আতুম (/ɑ.tum/, মিশরীয়: jtm(w) বা tm(w), পুনর্নির্মিত রূপ: [jaˈtaːmuw]; কপটিক: ⲁⲧⲟⲩⲙ আতোউম),[৩][৪] (নামান্তরে আতেম বা তেম) হলেন মিশরীয় পুরাণে আদ্যকালীন দেবতা, যাঁর থেকে অন্য সব কিছু উত্থিত হয়েছিল। তিনি নিজেকে সৃষ্টি করেছিলেন এবং শু ও নেফনুতের জন্ম দিয়েছিলেন। এই দেব-দম্পতি হলেন অন্য সকল মিশরীয় দেবদেবীর পূর্বসূরি। আতুম অস্তগামী সূর্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। আদ্যকালীন দেবতা ও অস্তগামী সূর্য হিসেবে আতুম ক্থনিক ও পাতাললোকের সঙ্গে এক যোগ ছিল।[৫] প্রাচীন মিশরীয়দের কাছে আতুমের গুরুত্ব প্রাচীন মিশরের ইতিহাসের সমগ্র অংশ জুড়ে প্রসারিত ছিল। মনে করা হয়, প্রাক্-রাজবংশীয় যুগ থেকে ধর্মাদর্শে আতুম বিরাজমান ছিলেন। পুরনো রাজ্যের শাসনকালে তিনি অধিকতর গুরুত্ব অর্জন করেন এবং মধ্য ও নতুন রাজ্যের শাসনকালেও তাঁর পূজা প্রচলিত ছিল। যদিও এই সময় রে-এর তুলনায় তাঁর গুরুত্ব কিছুটা হ্রাস পেয়েছিল।
মনে করা হয় যে, আতুমের নামটি উদ্ভূত হয়েছে tm ক্রিয়াপদটি থেকে, যার অর্থ হল 'সমাপ্ত করা'। এই কারণে তাঁকে ব্যাখ্যা করা হয় "সম্পূর্ণ সত্ত্বা" হিসেবে এবং পৃথিবী-সম্পূর্ণকারী হিসেবেও। প্রাচীন মিশরীয়রা মনে করত সৃষ্টিচক্রের শেষে জলময় বিশৃঙ্খলা থেকে তিনি পৃথিবীকে ফিরিয়ে দেন। সৃষ্টিকর্তা হিসেবে তাঁকে দেখা হত জগতের আদিপুরুষ হিসেবে। দেবদেবীরা এবং ব্রহ্মাণ্ড তাঁর জীবনদায়ী শোক্তি বা কা প্রাপ্ত হতেন।[৬]
আতুম হলেন একেবারে প্রথম যুগ থেকে একজন সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রায়শই উল্লিখিত দেবতা। এর প্রমাণ পাওয়া যায় পিরামিড লিপিগুলিতে তাঁর প্রাধান্যের মধ্যে দিয়ে, যেখানে মন্ত্রাবলির সংকলনের মধ্যে তাঁকে একাধারে এক সৃষ্টিকর্তা এবং রাজার পিতা রূপে প্রদর্শিত হয়েছে।[৬] আতুম কীভাবে অস্তিত্বমান হয়েছিলেন তা নিয়ে লিপিগুলির মধ্যে বিভিন্ন পাঠান্তর দৃষ্ট হয়। হেলিওপোলিসীয় দৃষ্টিকোণ থেকে, আতুম আদিতে আদ্যকালীন জলের মধ্যে স্থিত তাঁর অণ্ডের মধ্যে বিরাজমান ছিলেন, তারপর আদ্যকালীন বন্যার সময় তাঁর জন্ম হয় এবং তাঁর আদলে সৃষ্ট সকল বস্তুর উৎসে পরিণত হন। অপর দিকে মেমফিসীয়রা (মেমফিসের পুরোহিতবর্গ) মনে করতেন যে, প্তাহ আতুমকে এক অধিকতর বৌদ্ধিক পদ্ধতিতে সৃষ্টি করেন নিজের বাক্য ও চিন্তা দ্বারা। শাবাকা প্রস্তরে এমন বর্ণনাই পাওয়া যায়।[৭]
হেলিওপোলিসীয় সৃষ্টিতত্ত্বে আতুমকে প্রথম দেবতার মর্যাদা দিয়ে তাঁকে স্বয়ম্ভূ বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, তিনি আদ্যকালীন জল (নু থেকে উদ্ভূত একটি স্তুপের (বেনবেন) উপর বসে ছিলেন (অথবা তাঁকেই সেই স্তুপ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে)।[৮] আদিকালীন অতিকথাগুলিতে বলা হয়েছে যে, আতুম নিজের মুখ থেকে থুতু ফেলে দেবতা শু ও দেবী তেফনুতকে সৃষ্টি করেছিলেন।[৯][১০] অন্য একটি লিপিতে এমন বিতর্ক পাওয়া যায় যায় যে শু ও তেফনুতকে আতুম নিজের মুখের লালা বা বীর্য ছিটিয়ে সৃষ্টি করেননি, বরং তাঁরা সৃষ্টি হয়েছিলেন আতুমের ওষ্ঠ থেকে।[১১] আরেকটি লিপিতে বর্ণিত হয়েছে যে, এই দুই দেবদেবীর জন্ম আতুমের হাত থেকে। সেই লিপিটিতেই আতুমের হাতটিকে হেলিওপোলিসীয় সৃষ্টিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেবতার পত্নীর মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।[১২] অন্য অতিকথাগুলিতে বলা হয়েছে যে, আতুম হস্তমৈথুন করে সৃষ্টিকার্য করেছিলেন; এখানে তাঁর ব্যবহৃত হাতটিতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে তাঁর অন্তর্নিহিত নারীসত্ত্বা রূপে[১৩] এবং চিহ্নিত করা হয়েছে হাথোর বা ইউসাসেতের মতো দেবীদের সঙ্গে। আবার অন্যান্য ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যে, তিনি নিজের ছায়ার সঙ্গে মিলিত হয়ে সৃষ্টিকার্য চালিয়েছিলেন।[১৪]
পুরনো রাজ্যের আমলে মিশরীয়রা বিশ্বাস করত যে, আতুম মৃত রাজার আত্মাকে তাঁর পিরামিড থেকে তুলে নিয়ে যান নক্ষত্রময় স্বর্গলোকে।[১০] তিনি ছিলেন একজন সৌরদেবতাও; তাঁকে যুক্ত করা হত প্রাথমিক সূর্যদেব রা-এর সঙ্গে। আতুম বিশেষভাবে যুক্ত ছিলেন সন্ধ্যাকালীন সূর্যের সঙ্গে, যেখানে রা বা ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত দেবতা খেপরি যুক্ত ছিলেন প্রভাতী ও মধ্যাহ্নকালীন সূর্যের সঙ্গে।[১৫]
শবাধার লিপিগুলিতে আতুমের সঙ্গে ওসাইরিসের একটি গুরুত্বপূর্ণ কথোপকথন পাওয়া যায়। এই কথোপকথন থেকে জানা যায়, মিশরীয় পুরাণ মতে ব্রহ্মাণ্ডের সমাপ্তিকালে যখন সবকিছুর অস্তিত্ব লোপ পাবে তখন শুধু আদ্যকালীন জলের উপাদানগুলিই থেকে যাবে এবং আতুম ও ওসাইরিস তারপরেও লক্ষ লক্ষ বছর সাপ হিসেবে বিরাজমান থাকবেন।[১৬] আতুম দাবি করেছিলেন যে, তিনি তাঁর সৃষ্ট সব কিছু ধ্বংস করে আদ্যকালীন জল নু-কে ফিরিয়ে আনবেন।[১৭] আদ্যকালীন জলের বাইরে দেবদেবীদের অস্তিত্ব একদিন লোপ পাবে, এই বিশ্বাসটিকে এইভাবেই বর্ণনা করা হয়েছে।[১৬]
মৃতের বই-তে (যা গ্রিকো-রোমান যুগেও ব্যবহৃত হত) বলা হয়েছে যে, সৌরদেবতা আতুম বিশৃঙ্খলার জল থেকে উত্থিত হয়েছিলেন সাপের আকারে; কারণ সাপ হল এমন এক প্রাণী যা প্রতি সকালে নবীনতা লাভ করে।[১৮][১৯][২০]
আতুম হলেন প্রাক্-অস্তিত্ব ও অস্তিত্ব-পরবর্তী অবস্থার দেবতা। যুগ্ম সৌর চক্রে উভচর-রূপী আতেনের বিপরীতে থাকেন গুবরে পোকার মস্তকবিশিষ্ট দেবতা খেপরি—তরুণ সূর্যদেবতা, যাঁর নামটি মিশরীয় উৎসারিত হয়েছে মিশরীয় ḫpr, অর্থাৎ "অস্তিত্বমান হয়েছেন" এই অর্থ থেকে। খেপরি-আতুম সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তকে ঘিরে রাখেন, এইভাবেই প্রভাত ও সন্ধ্যার সমগ্র চক্রটি প্রতিফলিত হয়।[২১]
আতুম হলেন স্বয়ম্ভূ দেবতা। সৃষ্টির পূর্বে অস্তিত্বমান অন্ধকার ও অনন্ত জলময় গহ্বর থেকে তিনিই প্রথম উত্থিত হয়েছিলেন। এই বিশৃঙ্খলার শক্তি ও উপাদান থেকে তিনি তাঁর সন্তান অর্থাৎ প্রথম দেবদেবীদের সৃষ্টি করে নিজের একাকীত্ব দূর করেন। তিনি হাঁচির মাধ্যমে (কোনও কোনও বিবরণ অনুযায়ী বীর্যের মাধ্যমে) বায়ুদেবতা শু ও আর্দ্রতার দেবী তেফনুতকে সৃষ্টি করেন। এই দুই ভ্রাতা-ভগিনী তাঁদের চারিদিকে স্থিত আদ্যকালীন জল দেখে কৌতুহলী হয়ে অন্ধকারে হারিয়ে যান। আতুম নিজের সন্তানদিগের বিচ্ছেদ সহ্য করতে না পেরে রা-এর চক্ষু নামক এক অগ্নিময় দূত প্রেরণ করেন তাঁদের খুঁজতে। তাঁরা ফিরে এলে আতুমের চোখ থেকে যে আনন্দাশ্রু ঝরে পড়ে তা থেকেই প্রথম মানুষের সৃষ্টি হয়।[২২]
আতুমকে সচরাচর নরাত্বরোপিত প্রাণীর রূপে চিত্রিত করা হয়। তাঁর পরিধানে থাকে হয় রাজকীয় শিরাবরণী অথবা উচ্চ ও নিম্ন মিশরের যুগল সাদা বা লাল মুকুট, যা রাজপদের সঙ্গে তাঁর সংযুক্তিটিকে প্রতিফলিত করে। সাধারণভাবে তাঁকে দেখা যায় সিংহাসনে উপবিষ্ট অবস্থায় এবং পাতাললোক ও সৌর বৈশিষ্ট্যগুলির সঙ্গে তাঁর বর্ণনার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে মেষ-মস্তকরূপী দেবতা হিসেবে দেখানো হয়।[২৩] কখনও কখনও তাঁকে সাপ হিসেবেও চিত্রিত করা হয়; কারণ সৃষ্টিচক্রের শেষে তিনি সেই আকারেই প্রত্যাবর্তন করবেন। কখনও কখনও আবার তাঁকে নেউল, সিংহ, ষাঁড়, টিকটিকি বা উল্লুকের আকারেও চিত্রিত করা হত।[৬] যখন তাঁকে সৌরদেবতা হিসেবে চিত্রিত করা হত, তখন তাঁকে গুবরে পোকার আকারেও চিত্রিত করা হত এবং যখন তাঁর আদ্যকালীন উৎসের উল্লেখ করা হত তখন তাঁকে আদ্যকালীন স্তুপের আকারেও চিত্রিত করা হত।[২৩]
প্রাচীন মিশরের সমগ্র ইতিহাস জুড়ে আতুম পূজিত হয়ে এসেছিলেন। তাঁর উপাসনার প্রধান কেন্দ্র ছিল হেলিওপোলিস (মিশরীয়: আননু বা ইউনু)।[৬] হেলিওপোলিসে রা-আতুমের মন্দিরের একমাত্র অবশিষ্টাংশটি হল কায়রোর আল-মাতারিয়াহ্-এ অবস্থিত একটি ওবেলিস্ক। দ্বাদশ রাজবংশের ফ্যারাও প্রথম সেনুসরেত এটি নির্মাণ করেছিলেন এবং এখনও এটি মূল অবস্থানে দণ্ডায়মান রয়েছে।[২৪] পুরানো রাজত্বের শাসনে মিশরীয় ধর্মবিশ্বাসের কেন্দ্রে ছিলেন আতুমই। কারণ তিনি অস্তিত্বের উৎস, নিজের স্বয়ম্ভূ সত্ত্বা এবং আদ্যকালীন জল থেকে উদ্ভূত অন্য সকল কিছুর জন্য অংশত দায়ি ছিলেন। মনে করা হয় যে, প্রাক্-রাজবংশীয় যুগ থেকেই মিশরীয় ধর্মতত্ত্বের আদর্শে তাঁর অস্তিত্ব ছিল। পুরনো রাজত্বে পিরামিড লিপিগুলিতে তাঁর পুনঃপুনঃ উল্লেখ থেকে অনুমিত হয় যে এই সময় তিনি আরও প্রাধান্য অর্জন করেন। মধ্য রাজ্যের যুগেও তাঁর উপাসনা অব্যাহত ছিল। এই যুগেই মৃতের বই-তে তাঁর উল্লেখ পাওয়া যায়। এই বইতে পরলোকে যাত্রাকালে সহায়তাকারী মন্ত্রগুলিতে তাঁর উল্লেখ লক্ষিত হয়। পরবর্তীকালে নতুন রাজ্যে তাদের কাল্টগুলি আতুমের উদ্দেশ্যে উৎসর্গিত হয়েছিল। যেমন থিবীয় রাজকীয় মহাপুরোহিতাকে বলা হত আতুমের দিব্য আদরণীয়া। তিনিই সেই যুগে মন্দিরের আচার-অনুষ্ঠানকালে আতুমের হস্ত হিসেবে পরিগণিতা হতেন।[২৫] পরবর্তীকালে কেন্দ্রীয় স্থান অর্জন করেন রে। কিন্তু আতুম নিজের প্রাধান্য হারিয়ে ফেললেও প্রাচীন মিশরীয়রা কাল্ট-সংক্রান্ত আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁর পূজা চালিয়ে যায়; যে কাল্টগুলিতে বর্ণিত হয় যে রাজার সঙ্গে তাঁর এক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, এবং সেই সঙ্গে [[প্রাচীন মিশরের শেষ পর্যায়|শেষ পর্যায়ের অন্তভাগে ছোটো ছোটো রেলিকোয়ারি (সাধুসন্তদের দেহাবশেষ রাখার পেটিকা) ও মাদুলিতে টিকটিকির আকারে তাঁর চিত্র অঙ্কিত হত।[২৩]