আলেক্সি ক্লোদ ক্লেরো | |
---|---|
![]() আলেক্সি ক্লোদ ক্লেরো | |
জন্ম | [১] প্যারিস, ফ্রান্স | ১৩ মে ১৭১৩
মৃত্যু | ১৭ মে ১৭৬৫ প্যারিস, ফ্রান্স | (বয়স ৫২)
জাতীয়তা | ফরাসি |
পরিচিতির কারণ | ক্লেরো-র উপপাদ্য মিশ্র আংশিকতের সমতা বিষয়ক ক্লেরো-র উপপাদ্য ক্লেরো-র সমীকরণ ক্লেরো-র সম্বন্ধ চাঁদের অপদূরক অয়নচলন |
বৈজ্ঞানিক কর্মজীবন | |
কর্মক্ষেত্র | গণিত |
আলেক্সি ক্লোদ ক্লেরো (ফরাসি: Alexis Claude Clairaut; আ-ধ্ব-ব:[alɛksi klod klɛʁo]; ১৩ই মে, ১৭১৩, প্যারিস - ১৭ই মে, ১৭৬৫, প্যারিস) ছিলেন একজন ফরাসি গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ ও ভূপদার্থবিদ। তিনি ইংরেজ বিজ্ঞানী আইজাক নিউটনের একজন গুরুত্বপূর্ণ অনুসারী ছিলেন। পৃথিবীর আকৃতি যে নিখুঁত গোলকের মত নয়, বরং উত্তর ও দক্ষিণ মেরুতে সামান্য চ্যাপ্টা, এ সংক্রান্ত নিউটন ও হয়খেন্সের বিশ্বাস তিনি গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণ করেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি ফিনল্যান্ডের লাপলান্ড অঞ্চলে ভ্রমণ করেন এবং সেখানে পরীক্ষা নিরীক্ষা সম্পাদন করে পৃথিবীর আকৃতি সংক্রান্ত নিউটনের অনুমানটি সঠিক প্রমাণ করেন। এ প্রসঙ্গে ক্লেরো একটি গাণিতিক প্রমাণ প্রদান করেন, যা বর্তমানে ক্লেরো-র উপপাদ্য হিসেবে পরিচিত। অধিকন্তু তিনি মহাকর্ষীয় তিন-বস্তু সমস্যা নিয়ে কাজ করেন এবং চাঁদের কক্ষপথের অপদূরক অয়নচলন (apsidal precession) সম্পর্কে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে একটি সন্তোষজনক ফলাফলে উপনীত হন। গণিতশাস্ত্রে ক্লেরো-র সমীকরণ ও ক্লেরো-র সম্বন্ধ তাঁর দুইটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
ক্লেরো মাত্র ১৩ বছর বয়সে ১৭২৬ খ্রিস্টাব্দে প্যারিসের বিজ্ঞান আকাদেমিতে তাঁর প্রথম গণিত বিষয়ক গবেষণাপত্রটি পাঠ করেন, যার শিরোনাম ছিল কাত্র প্রোব্লেম স্যুর দ্য নুভেল কুর্ব ("নতুন কিছু বক্ররেখা বিষয়ক চারটি সমস্যা")। তিনি ১৭২৯ সালে ১৬ বছর বয়সে দ্বৈত বক্রতাবিশিষ্ট বক্ররেখাগুলির উপরে তার গবেষণাকর্ম সমাপ্ত করেছিলেন এবং এ জন্য তাঁকে প্যারিস আকাদেমি-র সদস্যপদে নির্বাচন করার জন্য মনোনয়ন প্রদান করা হয়। শেষ পর্যন্ত ১৭৩১ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে ক্লেরো প্যারিস বিজ্ঞান আকাদেমির ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। সেখানে তিনি নিউটনের প্রাকৃতিক দর্শনের অনুসারী কিছু বিজ্ঞানীদের দলে যোগ দেন, যাদের নেতৃত্বে ছিলেন পিয়ের লুই মোপেরত্যুই, যিনি নিজে মাত্র ৩৩ বছর বয়সী এক তরুণ আকাদেমি সদস্য ছিলেন। এছাড়া ক্লেরো এমিলি দ্যু শাতলে ও ভলতেয়ারের সাথেও বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন।
ক্লেরো ১৭৪৫ থেকে ১৭৫৬ পর্যন্ত শাতলেকে নিউটনের প্রিন্সিপিয়া ম্যাথেম্যাটিকা গ্রন্থটি ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করতে সাহায্য করেন। শাতলে-র গ্রন্থটিতে নিউটনের লেখার অনুবাদের পাশাপাশি ক্লেরো-র নিজস্ব তত্ত্বগুলিও যোগ করে দেওয়া হয়।
১৭৩৩ থেকে ১৭৪৩ সাল পর্যন্ত ক্লেরো গণিতের অনেকগুলি ক্ষেত্রে মৌলিক অবদান রাখেন। তিনি ভেদের কলনবিদ্যা, ঘূর্ণনের দ্বিঘাত ত্রিমাত্রিক তলসমূহের ভূমিতিকসমূহ, কিছু বিশেষ অন্তরকল সমীকরণ (যেগুলি বর্তমানে ক্লেরো-র অন্তরকল সমীকরণসমূহ নামে পরিচিত), সমাকলন, প্রথম-ঘাতের অন্তরকল সমীকরণসমূহের সমাধানের জন্য সমাকল উৎপাদকসমূহের অস্তিত্ব প্রমাণ, গতিবিদ্যা, ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে গবেষণাকর্ম প্রকাশ করেন, যেগুলিতে জোহান বের্নুই ও লেওনার্ড অয়লারের মতো বিখ্যাত গণিতবিদেরা আগ্রহী ছিলেন।
১৯৩৬-৩৭ সালে মোপেরত্যুই, শার্ল কাম্যু ও সেলসিয়াসের সাথে ক্লেরো ফিনল্যান্ডে গিয়ে একটি মধ্যরেখার ১ ডিগ্রি পরিমাণ দূরত্ব পরিমাপ করেন। এই অভিযানে পর্যবেক্ষণকৃত উপাত্তের উপর ভিত্তি করে ১৯৪৩ সালে তিনি তেওরি দ্য লা ফিগ্যুর দ্য লা তের (Théorie de la figure de la Terre, "পৃথিবীর আকৃতি বিষয়ক তত্ত্ব") গ্রন্থটি প্রকাশ করেন, যাতে গাণিতিক তত্ত্ব সহকারের নিউটন ও হয়খেন্সের অনুমান প্রমাণ করা হয়, যে অনুমানটি অনুযায়ী পৃথিবী মেরুদেশীয় অঞ্চলে খানিকটা চ্যাপ্টা, অর্থাৎ পৃথিবীর আকৃতি একটি পিষ্ট আবর্ত উপগোলকের ন্যায়। এই গ্রন্থটি উদস্থিতিবিদ্যার ভিত্তি স্থাপনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ক্লেরো এরপরে সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদের পারস্পরিক মহাকর্ষ বলের অধীনে গতি কীরূপ হবে, তার একটি সাধারণ সমাধান বের করার চেষ্টা করেন এবং ১৭৫২ সালে তেওরি দ্য লা ল্যুন ("চাঁদ বিষয়ক তত্ত্ব") নামক গ্রন্থ ও এর দুই বছর পরে চন্দ্র বিষয়ক সাংখ্যিক উপাত্তগুলির সারণীগুলি প্রকাশ করেন। এ সমস্যা সমাধানে সর্বকালের অন্যতম সেরা গণিতবিদ লিওনার্ড অয়লার যেখানে সফল হননি, ক্লেরো সেখানে সফলতা দেখান। ক্লেরো তাঁর সমাধান পদ্ধতিটি হ্যালি-র ধূমকেতুর গতি নির্ণয়ে প্রয়োগ করেন ও সফলভাবে ধূমকেতুটির অনুসূরে (সূর্যের নিকটতম বিন্দু) পৌঁছানোর তারিখ পূর্বাভাস করেন।
প্যারিসের বিজ্ঞান আকাদেমির পাশাপাশি ক্লেরো লন্ডনের রাজকীয় সমাজ (রয়্যাল সোসাইটি), বার্লিন অ্যাকাডেমি, সেন্ট পিটার্সবার্গ অ্যাকাডেমি ও বোলোনিয়ার অ্যাকাডেমির সদস্য নির্বাচিত হন।