ব্স্কাল-ব্জাং-র্গ্যা-ম্ত্শো (তিব্বতি: བསྐལ་བཟང་རྒྱ་མཚོ་, ওয়াইলি: bskal bzang rgya mtsho), (১৭০৮ – ১৭৫৭) তিব্বতী বৌদ্ধধর্মের অন্যতম প্রধান ধর্মসম্প্রদায় দ্গে-লুগ্স ধর্মসম্প্রদায়ের সপ্তম দলাই লামা ছিলেন।
ব্স্কাল-ব্জাং-র্গ্যা-ম্ত্শো ১৭০৮ খ্রিষ্টাব্দে তিব্বতের খাম্স অঞ্চলের লি-থাং নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ছিল ব্সোদ-নাম্স-দার-র্গ্যাস (ওয়াইলি: bsod nams dar rgyas) এবং মাতার নাম ছিল ব্সোদ-নাম্স-ছোস-ম্ত্শো (ওয়াইলি: bsod nams chos mtsho)।[১]
ষষ্ঠ দলাই লামা ত্শাংস-দ্ব্যাংস-র্গ্যা-ম্ত্শো নিজের পুনর্জন্মের ভবিষ্যদ্বাণীর ওপর ভিত্তি করে একটি কবিতা রচনা করেন যেখানে তিনি মৃত্যুর পর লি-থাং অঞ্চল থেকে ফিরে আসবেন বলে জানিয়েছিলেন।[n ১] ব্স্কাল-ব্জাং-র্গ্যা-ম্ত্শোর জন্মের পর থেকে পূর্ব তিব্বতে দলাই লামার পুনর্জন্মের আবির্ভাব ঘটেছে বলে সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে। এই সময় লাসা শহরের শাসনকর্তা কোশোত মঙ্গোল নেতা ল্হাজাং খান তার পুত্র ঙ্গাগ-দ্বাং-য়ে-শেস-র্গ্যা-ম্ত্শোকে ষষ্ঠ দলাই লামা হিসেবে অধিষ্ঠিত করেছিলেন, কিন্তু অধিকাংশ তিব্বতীরা তাকে দলাই লামা হিসেবে স্বীকার করতে রাজী ছিলেন না। নতুন দলাই লামার আবির্ভাবের খবর পেয়ে অখুশি ল্হাজাং খান নোর-বু-দ্ঙ্গোস-গ্রুব (ওয়াইলি: nor bu dngos grub) নামক এক আধিকারিককে ব্যাপারটি অনুসন্ধান করতে পূর্ব তিব্বত পাঠান। এই আধিকারিক রাজরোষ থেকে ব্স্কাল-ব্জাং-র্গ্যা-ম্ত্শোকে বাঁচানোর উদ্দেশ্যে তাকে প্রকৃত দলাই লামা হিসেবে স্বীকৃতি দেননি এবং তার পরামর্শে পিতা ব্সোদ-নাম্স-দার-র্গ্যাস শিশুটিকে নিয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেন। ১৭১৪ খ্রিষ্টাব্দে ব্সোদ-নাম্স-দার-র্গ্যাস তার পুত্রকে স্দে-দ্গে রাজ্যে আশ্রয় লাভের জন্য অনুরোধ করলে ব্স্তান-পা-ত্শে-রিং (ওয়াইলি: bstan pa tshe ring) নামক ঐ রাজ্যের রাজকুমার তার অনুরোধে সাড়া দেন। কোকোনরের মঙ্গোল নেতা চিংওয়াং বতুর্তাইজি ত্শাংস-দ্ব্যাংস-র্গ্যা-ম্ত্শোকে খাম্স থেক আমদো অঞ্চলে সরিয়ে নিয়ে যেতে সহায়তা করেন। এরপর গোপণে ত্শাংস-দ্ব্যাংস-র্গ্যা-ম্ত্শোকে সপ্তম দলাই লামা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ১৭১৬ খ্রিষ্টাব্দে কাংজি সম্রাট একটি চীনা-তিব্বতী-মঙ্গোল অশ্বারোহী বাহিনীর তত্ত্বাবধানে সপ্তম দলাই লামাকে স্কু-'বুম বৌদ্ধবিহার নিয়ে যাওয়ার জন্য রাজপ্রতিনিধি পাঠান। এই বিহারেই সপ্তম দলাই লামাকে সর্বসমক্ষে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করা হয়[৩]:২৭৬-২৮২ ও তাকে শিক্ষা প্রদান করা হয়।[১] ব্লো-ব্জাং-ব্স্তান-পা'ই-র্গ্যাল-ম্ত্শান (ওয়াইলি: blo bzang bstan pa'i rgyal mtshan) নামক দ্বিতীয় ছু-ব্জাং (ওয়াইলি: chu bzang) উপাধিধারী বৌদ্ধ লামা তাকে শিক্ষার্থীর শপথ প্রদান করেন।[৪]
১৭১৭ খ্রিষ্টাব্দে দ্জুঙ্গার মোঙ্গল সেনাবাহিনী মধ্য তিব্বত আক্রমণ করে ল্হাজাং খানকে হত্যা করে এবং তার পুত্র ঙ্গাগ-দ্বাং-য়ে-শেস-র্গ্যা-ম্ত্শোকে দলাই লামার পদ থেকে সরিয়ে দেয়। কিন্তু এরপর তারা ব্যাপক হারে লুঠপাট, ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড শুরু করে। তারা এই সময় সালুঈন নদীর যুদ্ধে চিং সাম্রাজ্যের একটি সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করে।[৩]:২৭৬-২৮২[৫]:৪৮ ১৭২০ খ্রিষ্টাব্দে কাংজি সম্রাট দ্বারা প্রেরিত চীনা-তিব্বতী সেনাবাহিনী একটি বড় সামরিক অভিযানে দ্জুঙ্গার মোঙ্গলদের তিব্বত থেকে হঠিয়ে দিতে সক্ষম হয়।[৩]:২৯০ চিং রাজপুত্র ইয়িন্তি (胤禵) এবং তিব্বতী বৌদ্ধধর্মের প্রতিনিধিদের নেতৃত্বে এই বাহিনী ১৭২১ খ্রিষ্টাব্দে ব্স্কাল-ব্জাং-র্গ্যা-ম্ত্শোকে স্কু-'বুম বৌদ্ধবিহার থেকে লাসা শহরে নিয়ে আসেন। ১৭২০ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে পঞ্চম পাঞ্চেন লামা তাকে ভিক্ষুর শপথ প্রদান করেন। এই সময় তার উল্লেখযোগ্য শিক্ষক ছিলেন ব্লো-ব্জাং-দার-র্গ্যাস, দ্পাল-ল্দান-গ্রাগ্স-পা প্রভৃতি বিখ্যাত বৌদ্ধ পণ্ডিত।[১]
কাংজি সম্রাটের মৃত্যুর পর ইয়োংঝেংয়ের শাসনকালে ১৭২৩ খ্রিষ্টাব্দে মোঙ্গলরা কোকোনর অঞ্চলে চিং সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে দেয়। এর বিপরীতে ইয়োংঝেং ও তার মাঞ্চু সেনাবাহিনী পোড়ামাটি নীতি অবলম্বন করে আমদো অঞ্চলে বিদ্রোহী মঙ্গোলদের সমর্থক হিসেবে পরিচিত তিব্বতীদের বৌদ্ধবিহার ও ঘরবাড়িগুলিকে ধূলিসাৎ করে দেয়। এই লড়াইয়ে সপ্তম দলাই লামার শিক্ষক ব্লো-ব্জাং-ব্স্তান-পা'ই-র্গ্যাল-ম্ত্শান (ওয়াইলি: blo bzang bstan pa'i rgyal mtshan) নামক দ্বিতীয় ছু-ব্জাং (ওয়াইলি: chu bzang) উপাধিধারী বৌদ্ধ লামার মৃত্যু ঘটে। এরপর সপ্তম দলাই লামার অনুরোধে চিং সম্রাট ইয়োংঝেং আমদো অঞ্চলে ক্ষতিগ্রস্ত বৌদ্ধবিহারগুলির সংস্কারের নির্দেশ দেন।[১]
পোতালা প্রাসাদে সপ্তম দলাই লামা অধিষ্ঠিত থাকলেও মধ্য তিব্বতের মূল ক্ষমতা চিং সাম্রাজ্যের হাতেই ছিল। তিব্বত শাসনের উদ্দেশ্যে তারা খাং-ছেন-নাস-ব্সোদ-নাম্স-র্গ্যাল-পো (ওয়াইলি: khang chen nas bsod nams rgyal po), ঙ্গা-ফোদ-র্দো-র্জে-র্গ্যাল-পো (ওয়াইলি: nga phod rdo rje rgyal po), লুম-পা-বা-ব্ক্রা-শিস-র্গ্যাল-পো (ওয়াইলি: lum pa ba bkra shis rgyal po), স্ব্যার-রা-বা-ব্লো-গ্রোস-র্গ্যাল-পো (ওয়াইলি: sbyar ra ba blo gros rgyal po,) এবং ফো-ল্হা-নাস-ব্সোদ-নাম্স-স্তোব্স-র্গ্যাস (ওয়াইলি: pho lha nas bsod nams stobs rgyas) নামক পাঁচজন তিব্বতী অভিজাতের ওপর সমস্ত ক্ষমতা অর্পণ করেন। সপ্তম দলাই লামার পিতা ব্সোদ-নাম্স-দার-র্গ্যাস (ওয়াইলি: bsod nams dar rgyas) এই ক্ষমতার কেন্দ্রে সামিল হয়ে পড়েন। ১৭২৭ খ্রিষ্টাব্দে ঙ্গা-ফোদ-র্দো-র্জে-র্গ্যাল-পো, লুম-পা-বা-ব্ক্রা-শিস-র্গ্যাল-পো, স্ব্যার-রা-বা-ব্লো-গ্রোস-র্গ্যাল-পো এই তিন অভিজাত ব্সোদ-নাম্স-দার-র্গ্যাসের সাথে মিলিত ভাবে ষড়যন্ত্র করে খাং-ছেন-নাস-ব্সোদ-নাম্স-র্গ্যাল-পোকে সপরিবারে হত্যা করে। ফো-ল্হা-নাস-ব্সোদ-নাম্স-স্তোব্স-র্গ্যাস এই হত্যাকাণ্ডের খবর শুনে সৈন্যবাহিনী নিয়ে মধ্য তিব্বতের বিভিন্ন দুর্গ অধিকারে নিয়ে নেন। এরপর তার সমর্থনে চিং সম্রাট মাঞ্চু সেনাবাহিনী পাঠালে এই বিদ্রোহ দমন করা হয়। তিব্বতের সমগ্র ক্ষমতা ফো-ল্হা-নাস-ব্সোদ-নাম্স-স্তোব্স-র্গ্যাসের ওপর ন্যস্ত হয়। ক্ষমতা লাভের পর তিনি সপ্তম দলাই লামাকে লাসা থেকে নির্বাসিত করে খাম্স অঞ্চলের পূর্বপ্রান্তে ম্গার-থার (ওয়াইলি: mgar thar) নামক এক নব্য প্রতিষ্ঠিত বৌদ্ধবিহারে পাঠিয়ে দেন।[১]
পরবর্তী আট বছর সপ্তম দলাই লামা ধর্ম শিক্ষা ও সাধনায় মনোনিবেশ করেন। এই সময় তার সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য শিক্ষক ছিলেন ঙ্গাগ-দ্বাং-ম্ছোগ-ল্দান (ওয়াইলি: ngag dbang mchog ldan) নামক বিখ্যাত বৌদ্ধ পণ্ডিত। ১৭৩৫ খ্রিষ্টাব্দে চিং সম্রাট ইয়োংঝেংয়ের সিদ্ধান্তে সপ্তম দলাই লামাকে লাসা প্রত্যাবর্তনের নির্দেশ দেওয়া হয়। সপ্তম দলাই লামা শুধুমাত্র ধর্মীয় কার্যকলাপেই সীমাবদ্ধ থাকবেন, এই শর্তে ফো-ল্হা-নাস-ব্সোদ-নাম্স-স্তোব্স-র্গ্যাস এই নির্দেশ মেনে নেন। ইয়োংঝেংয়ের নির্দেশে পাঁচশো ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রতিনিধি তাকে লাসা নিয়ে যান। এই ধর্মীয় রাজপ্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন রোল-পা'ই-র্দো-র্জে নামক তৃতীয় ল্চাং-স্ক্যা হো-থোগ-থু (ওয়াইলি: lcang-skya ho-thog-thu) উপাধিধারী লামা, যিনি পরবর্তী দুই বছর সপ্তম দলাই লামার অন্যতম প্রধান শিষ্য হন।[১]
১৭৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ফো-ল্হা-নাস-ব্সোদ-নাম্স-স্তোব্স-র্গ্যাস মৃত্যুবরণ করলে তার দ্বিতীয় পুত্র 'গ্যুর-মেদ-র্নাম-র্গ্যাল (ওয়াইলি: 'gyur med rnam rgyal) তিব্বতের শাসনভার লাভ করেন। তিনি চিং সাম্রাজ্যের শত্রু দ্জুঙ্গার মোঙ্গলদের দিকে সন্ধি স্থাপনের চেষ্টা শুরু করেন।[৬]:১২৯ এরফলে মাঞ্চু আম্বানদের নির্দেশে 'গ্যুর-মেদ-র্নাম-র্গ্যালকে হত্যা করা হলে লাসায় দাঙ্গার সূত্রপাত ঘটে। এই দাঙ্গায় তিব্বতীদের হাতে বেশ কিছু চীনা ও আম্বানদের হত্যা করা হয়। চিং সম্রাট চিয়ানলোং (乾隆) তিব্বতে যে প্রতিনিধিদল পাঠান, তারা দাঙ্গাকারীদের কারাদন্ড ও মৃত্যুদন্ড দেন। এই সময় চিয়ানলোং সিদ্ধান্ত নেন যে, তিব্বতের শাসনভার তিব্বতীদের হাতে না রেখে দুইজন আম্বানের দায়িত্বে রাখা হবে। কিন্তু মাঞ্চুদের সরাসরি অধীনে না রেখে তিব্বতীদের দলাই লামার রাজনৈতিক ক্ষমতাধীনে রাখার ব্যাপারে এই সময় সপ্তম দলাই লামার শিষ্য রোল-পা'ই-র্দো-র্জে সম্রাটকে বোঝাতে সক্ষম হন। এরফলে 'গ্যুর-মেদ-র্নাম-র্গ্যালের প্রভাবাধীন গোষ্ঠীর হাত থেকে ক্ষমতা সপ্তম দলাই লামা ও মাঞ্চু আম্বানদের হাতে অর্পিত হয়।[১][n ২]
১৭৫১ খ্রিষ্টাব্দে ব্কা'-শাগ (ওয়াইলি: bka' shag) বা মন্ত্রী পরিষদ নামক পদের সৃষ্টি করা সপ্তম দলাই লামার সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব।[৪] এই ব্যবস্থা তিব্বতে ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত চালু ছিল এবং বর্তমানে ভারতে আশ্রিত কেন্দ্রীয় তিব্বতী প্রশাসনেও চালু রয়েছে। এইব্যবস্থার ফলে একজন ব্যক্তির ওপর সমস্ত ক্ষমতা অর্পিত না হয়ে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটে।[৪]
১৭৫৪ খ্রিষ্টাব্দে সপ্তম দলাই লামা সাধারন কর্মচারীদের শিক্ষার উদ্দেশ্যে কিছু নতুন বিদ্যালয় স্থাপন করেন যেখানে লিপি অঙ্কন, জ্যোতিষ ও সাহিত্য সম্বন্ধে পড়ানো হত। পোতালা প্রাসাদের নিকটে অবস্থিত 'দোদ-দ্পাল (ওয়াইলি: 'dod dpal) নামক শিল্পকর্মশালা এই সকল বিদ্যালয়ের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য। এর সঙ্গে য়িগ-ত্শাং-লাস-খুং (ওয়াইলি: yig tshang las khung) নামক নথিপত্র সংকলন কেন্দ্র স্থাপন করাও হয়। এই সমস্ত কেন্দ্রগুলি তিব্বতের ধর্মীয় প্রশাসনকে সুচারুরূপে চালু রাখতে উপযোগী হয়।[১]
|তারিখ=
(সাহায্য)
|তারিখ=
(সাহায্য)
পূর্বসূরী ত্শাংস-দ্ব্যাংস-র্গ্যা-ম্ত্শো |
ব্স্কাল-ব্জাং-র্গ্যা-ম্ত্শো সপ্তম দলাই লামা |
উত্তরসূরী ব্যাম্স-স্পেল-র্গ্যা-ম্ত্শো |