শীলভদ্র | |
---|---|
জন্ম | আনুমানিক ৫২৯ খ্রিস্টাব্দ সমতট রাজ্য (দক্ষিণ পূর্ব বাংলাদেশ) |
মৃত্যু | ৬৫৪ খ্রিস্টাব্দ |
পেশা | অধ্যক্ষ |
পরিচিতির কারণ | যোগাচারবিদ্যা |
মহাস্থবির শীলভদ্র (সংস্কৃত: शीलभद्र, ঐতিহ্যগত চীনা: 戒賢) বৌদ্ধশাস্ত্রের একজন বিদগ্ধ ব্যক্তি ও দার্শনিক ছিলেন। তিনি নালন্দা মহাবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ ছিলেন। তিনি বিখ্যাত চৈনিক পর্যটক ও সন্ন্যাসী হিউয়েন সাঙের শিক্ষক ছিলেন।
"শীল" শব্দের অর্থ স্বভাব,চরিত্র,সম্ভ্রম,বংশ-মর্যাদা ইত্যাদি। "ভদ্র" অর্থ শিষ্ট,বিনয়ী বা আচরণগত দিক থেকে মার্জিত।[১] তাই বলা যায় মহাস্থবিরের "শীলভদ্র" নামটি মার্জিত স্বভাবের একজন ব্যক্তিকে নির্দেশ করছে।
মহাস্থবির শীলভদ্র ৫২৯ খ্রিস্টাব্দে সমতট রাজ্যভুক্ত বর্তমান বাংলাদেশের অন্তর্গত কুমিল্লা জেলার চান্দিনার কৈলাইন গ্রামে এক ব্রাহ্মণ রাজপরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। হিউয়েন সাঙের মতে, তিনি যে ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তা ছিল সমতটের ভদ্র রাজবংশ। বাল্যকাল থেকেই তিনি অধ্যয়নপ্রিয় ছিলেন। জ্ঞান-অন্বেষণে ধর্মীয় গুরুর সন্ধানে তিনি তৎকালীন ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্য ও স্থান পরিভ্রমণ করেন। একসময় তিনি মগধের নালন্দা মহাবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমন করেন। এখানে তিনি মহাবিহারের অধ্যক্ষ আচার্য ধর্মপালের অধীনে শিক্ষালাভ করেন। তার কাছেই তিনি বৌদ্ধধর্মের সাথে পরিচিতি লাভ করেন। এভাবে তিনি বৌদ্ধধর্মের শাস্ত্রীয় বিষয়ে অনেক জ্ঞান লাভ করেন। শীল ভদ্র ছিলেন নালন্দা মহাবিহারের একজন পন্ডিত ।
সে সময়ে দক্ষিণ ভারতের একজন পণ্ডিত শীলভদ্রের শিক্ষক ধর্মপালের পাণ্ডিত্য এবং জ্ঞান সাধনায় ঈর্ষান্বিত হয়ে তাকে ধর্মের বিষয়াদি নিয়ে তর্কযুদ্ধে আহ্বান জানান। স্থানীয় রাজার অনুরোধে গুরু ধর্মপাল এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার আহ্বান গ্রহণ করেন। কিন্তু শীলভদ্র তার গুরুর পরিবর্তে নিজেই তর্কযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তখন তার বয়স মাত্র তিরিশ বছর ছিল। তবুও তিনি তার অগাধ জ্ঞান এবং প্রতিভা দিয়ে এই যুদ্ধে জয়ী হন। পুরস্কারস্বরুপ রাজা তাকে একটি নগর উপহার দেন। সেখানে শীলভদ্র একটি বিহার গড়ে তোলেন।
ধর্মপালের মৃত্যুর পর মহাস্থবির শীলভদ্র নালন্দা মহাবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য নিযুক্ত হন। তার পাণ্ডিত্য এত অগাধ আর স্বীকৃত ছিল যে, নালন্দা মহাবিহারের অধিবাসীরা তার প্রতি শ্রদ্ধাস্বরুপ কখনো তার নাম উচ্চারণ করতেন না। তাকে সবাই 'ধর্মনিধি' নামে ডাকতেন।
শীলভদ্রের জীবন সম্পর্কে খুব বেশি কিছু ভারতীয় কোন গ্রন্থের মাধ্যমে পাওয়া যায়না। চীনা পর্যটক ও ধর্মশাস্ত্রবিদ হিউয়েন সাঙের বিবরণ থেকেই তার জীবন সম্পর্কে সর্বাধিক তথ্য পাওয়া যায়। হিউয়েন সাঙের মতে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে যেসব অধ্যাপক মহাবিহারে অধ্যাপনা করতে এসেছিলেন তাদের মধ্যে শীলভদ্রই শ্রেষ্ঠ ছিলেন। প্রাপ্ত তথ্যমতে, একদিন শীলভদ্র স্বপ্নে দেখেন মহাবিহারে হিউয়েন সাঙ এসেছেন। তাই হিউয়েন সাঙ সেখানে এলে শীলভদ্র তাকে সাদরে অভ্যর্থনা জানান।[২] এখানে হিউয়েনা সাঙ ২২ বছর ধরে শীলভদ্রের কাছে যাবতীয় শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। এরপর তিনি 'সিদ্ধি' নামক একটি গ্রন্থ রচনা করেন।
শীলভদ্র অতীব বিনয়ী, সজ্জন, প্রজ্ঞাবান, মহাজ্ঞানী এবং নির্লোভী ছিলেন। রাজপুত্র হয়েও অর্থ ও ক্ষমতার প্রতিপত্তি ত্যাগ করেছিলেন। মগধের রাজা তাকে নগর উপহার দিতে চাইলে তিনি বিনয়ের সাথে তা প্রত্যাখান করেন। জীবনের পরম অর্থ তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন। আজীবন অবিবাহিত থেকে তিনি শুধু জ্ঞানই আহরণ করে গেছেন এবং তা সমভাবে বিতরণ করেছেন। তিনি একজন শক্তিশালী শিক্ষা সংগঠক ছিলেন। তিনি 'শীলভদ্র সংঘারাম বিহার' প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মহাস্থবির শীলভদ্র দীর্ঘজীবন লাভ করেছিলেন। তিনি ৬৫৪ খ্রিষ্টাব্দে ১২৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
শীলভদ্র গৌতম বুদ্ধের উপদেশগুলোকে ধর্মচক্রের তিনটি আবর্তনের উপর ভিত্তি করে বিভাজন করেছিলেন। এগুলো সন্ধিনির্মোচন সূত্র নামক গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে।[৩]
প্রথম আবর্তন: এতে জীবনের পরম চারটি সত্যের কথা বলা হয়েছে। ধর্মচক্রপ্রবর্তনসূত্র নামক গ্রন্থে এর উদাহরণসহ ব্যাখ্যা রয়েছে। এটি বৌদ্ধধর্মের আদি উপদেশ ও প্রাথমিক যুগে বৌদ্ধধর্মের স্বরূপকে তুলে ধরে।
দ্বিতীয় আবর্তন: গৌতম বুদ্ধ বারাণসীতে শিষ্যদের যেসব উপদেশ দিয়েছিলেন তা এর অন্তর্ভুক্ত। ঘটনার কোনো অস্তিত্ব, উদ্ভব ইত্যাদি নেই এবং সবই স্থির বা নিশ্চল এসব তত্ত্ব এই আবর্তনের অংশ। এই উপদেশের ভিত্তি প্রজ্ঞাপারমিতা উপদেশ। প্রাচীন দার্শনিক নাগার্জুন তাঁর মাধ্যমক (মাধ্যমিক নয়) দার্শনিক মতবাদে এটা উদাহরণসহ ব্যাখ্যা করেন।
তৃতীয় আবর্তন:এটি প্রায় দ্বিতীয় আবর্তনের মতো। কিন্তু এটি সুস্পষ্টভাবে বোঝানোর জন্য এর কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই আবার মতভেদও নেই। সন্ধিনির্মোচন সূত্র এর ভিত্তি।[৪] প্রথম ও দ্বিতীয় খ্রিস্টপূর্ব শতাব্দীর লেখায় এর বিবরণ পাওয়া যায়। অসঙ্গ ও বসুবন্ধু দুই ভাই তাঁদের যোগাচার দার্শনিক মতবাদে এটি আলোচনা করতেন।
মহাস্থবির শীলভদ্র তার জীবনে শত শত গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। কিন্তু সেসবের কোন নিদর্শন পাওয়া যায়নি। তবে তার রচিত একটি গ্রন্থ পাওয়া গেছে। গ্রন্থটির নাম "আর্য-বুদ্ধভূমি ব্যাখ্যান"। তিব্বতীয় ভাষায় এই গ্রন্থের অস্তিত্ব বিদ্যমান। এই গ্রন্থটি বৌদ্ধধর্ম ও দর্শনের উপর রচিত ছিল।