সুড়ঙ্গ ভূমির নিচে অবস্থিত একটি যাত্রাপথ, যেটি মাটি বা পাথরের ভেতর দিয়ে খনন করা হয় এবং প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ বাদ দেয়া হয়, সাধারণত শেষ প্রান্তে থাকে। এক্ষেত্রে একটি পাইপকে সুড়ঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না,যদিও আগের খনন করার প্রক্রিয়ার পরিবর্তে বর্তমানে ডুবন্ত টিউব ব্যবহার করে সুড়ঙ্গ প্রস্তুত করা হয়। সুড়ঙ্গ মূলত হেঁটে চলাচল বা গাড়ি চলাচল, রেল চলাচল ও নৌকা চলাচলের জন্য হতে পারে। সুড়ঙ্গ একটি দ্রুত বাণিজ্যের যোগাযোগ ব্যবস্থা। কিছু সুড়ঙ্গ পানি নেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়। আবার কিছু বৈদ্যুতিক তার ও টেলিযোগাযোগ তার পরিবহনেও সুড়ঙ্গের ব্যবহার হয়। মিলিটারিরা মাঝে মাঝে গোপন সুড়ঙ্গ ব্যবহার করেন। সন্ত্রাসীরা মানব পাচার ও মাদকদ্রব্য পাচার করার জন্য গোপন সুড়ঙ্গ ব্যবহার করে। বিশেষ সুড়ঙ্গ, যেমন বন্যপ্রাণীদের পারাপার পথ, মানুষের তৈরি বেড়াগুলো নিরাপদে পার করতে ব্যবহার করা হয়। সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্কে সুড়ঙ্গকে যুক্ত করা যায়।
সুড়ঙ্গ প্রায় সময় লম্বা ও সরু হয়ে থাকে। এর দৈর্ঘ্য মূলত ব্যাস এর দ্বিগুণ হয়ে থাকে, যদিও ভিন্ন ধরনের সুড়ঙ্গও তৈরি করা হয়, যেমন সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে আড়াআড়ি পথ।
সুড়ঙ্গের বর্ণনা স্থানভেদে ভিন্ন হতে পারে। যেমন যুক্তরাজ্যে রাস্তার সুড়ঙ্গের সঙ্গা হবে, "সুড়ঙ্গ একটি ১৫০মিটার(৪৯০ফুট) বা তার বেশি দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট ঘেরাওকৃত সড়ক। "[১] আবার যুক্তরাষ্ট্রে এনএফপিএর কাছে সুড়ঙ্গের সঙ্গা, "এটি একটি ভূগর্ভস্থ স্থাপনা যেটির দৈর্ঘ্য ২৩মিটার থেকে বেশি ও ব্যাস ১,৮০০মিলিমিটার থেকে বেশি। "
যুক্তরাজ্যে রাস্তা বা রেলপথের নিচের যে সুড়ঙ্গ দিয়ে পথযাত্রী, সাইকেল বা প্রাণী চলাচল করে সেটি "সাবওয়ে" হিসেবে পরিচিত। যদিও ভুগর্বস্থ রেলপথ ব্যনস্থা বিভিন্ন শহরে বিভিন্ন নামে পরিচিত। লন্ডনে এটি "টিউব" নামে,গ্লাসগোতে "সাবওয়ে" এবং নিউ ক্যাসলে "মেট্রো" হিসেবে পরিচিত। যেসকল রাস্তা বা রেললাইন অন্য রাস্তা বা রেললাইন এর নিচ দিয়ে যায় তা "সেতু" হিসেবে পরিচিত, অথবা নালির ভেতর দিয়ে গেলে সেটি জলনালি হিসেবে পরিচিত। এখানে একটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন যে, যদি এটি নিচ দিয়ে যায় তাহলে এটাকে বলা হয় আন্ডারপাস, যদিও যখন একটি রেলপথের নিচ দিয়ে যায় তখন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে একে আন্ডারব্রিজ বলে। রাস্তা, নালি বা রেলপথ সংবলিত একটি লম্বা আন্ডারপাসকে সুড়ঙ্গ বলা হয়ে থাকে, যদিনা এটি অন্য কোন বস্তু বা দালানের নিচ দিয়ে যায়। নদীর নিচে যেকোন আকারের আন্ডারপাসকে সুড়ঙ্গ বলা হয়, এটি যেকোন কিছু পরিবহনের জন্যই হোক না কেন।
যুক্তরাষ্ট্রে, সাবওয়ে মানে একটি ভুগর্বস্ দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থা, এবং পথচারী আন্ডারপাস মূলত বাঁধ এর নিচে পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পথচারী সুড়ঙ্গ বা ফুটব্রিজগুলো রেল স্টেশন প্লাটফর্মের সাথে যুক্ত থাকে।
প্রথম দিকের সুড়ঙ্গ প্রযুক্তি মাইনিং ও মিলিটারি ইন্জিনিয়ারিং থেকে উদ্ভূত। "মাইনিং"(খনিজ নিষ্কাশনের জন্য অথবা বিপরীত আক্রমণের জন্য) শব্দটির তত্ত্ব "মিলিটারি ইঞ্জিনিয়ারিং" এবং "সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং" এর মাঝে গভীর ঐতিহাসিক সম্পর্ককে প্রকাশ করে।
আধুনিক সুড়ঙ্গের পূর্বে সেচ ও খাবারের জন্য পানি পরিবহন ও নালির কাজে সুড়ঙ্গ বানানো হত। প্রথম কানাত প্রায় ২০০০ খ্রিষ্টপূর্ব আগের তৈরি।
একটি বড় সুড়ঙ্গের কাজ ভূমির পরিস্থিতি ও অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে শুরু করা হয়। ভূমির ধরন পরীক্ষায় পাতাল থেকে মাটির নমুনা নেয়া বা অন্য ভূগর্বস্থ প্রক্রিয়া ব্যবহার হয়। পরীক্ষার পর সিদ্ধান্ত নেয়া হয় মাটি খননে কোন প্রক্রিয়া ও কি কি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হবে যা অচিন্তিত কোন ভূমির পরিস্থিতির ঝুঁকি হ্রাস করে। রাস্তা বানানোর সময়, অনুভূমিক ও উলম্ব রেখার সমতা রাখা হয় যাতে ভূমির সঠিক ব্যবহার করা যায়। সাধারণত সুড়ঙ্গ গভীরে স্থাপন করা হয় অথবা প্রয়োজন হয়, এতে শক্ত পাথর বা অন্যান্য কোন বস্তুর ভেতর দিয়ে খনন করা যায় যেগুলো খননের সময় সহজ ঠেক হিসেবে কাজ করে।
গতানুগতিক টেবিলে বসে কোন স্থানের সম্পর্কে বেশি তথ্য পাওয়া যায়না। যেমন:ঝুঁকিপূর্ন জায়গার অবস্থান ও পাথরের ধরন বা প্রকৃতি সম্পর্কে জানা সম্ভব হয় না। বড় প্রস্থের সুড়ঙ্গের ক্ষেত্রে এটি একটি সমস্যা। আরো তথ্য জানার জন্য একটি পাইলট সুড়ঙ্গ (বা ড্রিফট সুড়ঙ্গ) তৈরি করা হয়। ছোট এই সুড়ঙ্গটি যেকোন বিপৎসংকুল পরিস্থিতিতে কাজে লেগে থাকে। বিকল্প হিসেবে অনেক সময় মূল সুড়ঙ্গের সামনে আনুভূমিক কূপও তৈরি করা হয়।
অন্যান্য ভূমির বৈশিষ্ট্য:
পানি পারাপারের জন্য সুড়ঙ্গ তৈরি করা সেতুর থেকে বেশি ব্যয়বহুল। কিন্তু নৌচলাচলের জন্য উচ্চ ও অপসারণযোগ্য সেতুর ব্যবহার কমই হতে পারে ও জাহাজ চলাচলের জন্য তখন সুড়ঙ্গের প্রয়োজন হতে পারে।
প্রতিটি উপকূলে সেতুর গমনপথ সুড়ঙ্গের থেকে বড় হয়। ধনী জায়গাগুলোতে যেমন;ম্যানহাটন ও হংকং এ সুড়ঙ্গের পক্ষে থাকার এটি একটি বড় কারণ। বোস্টনের বিগ ডিগ প্রকল্পে রাস্তাকে একটি সুড়ঙ্গে পরিণত করা হয় যাতে যানচলাচল করার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, যানচলাচল কে লুকিয়ে রাখা যায় ও শহরটিকে পুনরায় নদীর মধ্যদিয়ে তৈরি করা যায়।
১৯৩৪ সালে সুউচ্চ সেতুর পরিবর্তে লিভারপুলে মার্সে নদীর নিচের কুইনসওয়ে সুড়ঙ্গ নির্বাচন করা হয়, এটা আশঙ্কা করা হতো যে যুদ্ধের সময় বিমান সেতুকে ধ্বংস করে দিতে পারে। সুউচ্চ সেতু যেটির নিচ দিয়ে পৃথিবীর বৃহৎ জাহাজও যেতে পারবে তার রক্ষণা বেক্ষণের ব্যয় একটি সুড়ঙ্গের ব্যয় থেকে বেশি। ১৯৭১ সালে মার্সের নিচে কিংসওয়ে সুড়ঙ্গটিরও একই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। হ্যাম্পটন রোড, ভার্জিনিয়াতে সুকৌশলী বিবেচনার দ্বারা সুড়ঙ্গকে সেতুর থেকে বেশি পছন্দ করা হয়, ধ্বংসযজ্ঞ চলার সময় সেতু ধ্বংস হলে সেটি ইউএস নেভির জাহাজগুলোকে নাভাল স্টেশন নোরফোক ছেড়ে যেতে বাধা দিবে।
যেসকল সুড়ঙ্গ পানি পারাপারের জন্য সেতুর পরিবর্তে তৈরি করা হয়েছে এগুলো হলো;নিউ ইয়র্ক শহরে ম্যানহাটন ও নিউ জার্সির মধ্য হল্যান্ড ও লিঙ্কন সুড়ঙ্গ,ম্যানহাটন ও লং আইল্যান্ড এর ভেতর দ্যা কুইনস মিডটাউন সুড়ঙ্গ, মিসিরিও ও অন্টারিওর মাঝে ডেট্রয়েট-উইন্ডসর সুড়ঙ্গ, নোরফোক ও ভার্জিনিয়ার ভেতর এলিজাবেথ নদীর সুড়ঙ্গসমূহ,
নেদারল্যান্ড এর ওয়েস্টার্ন স্কেল্ট সুড়ঙ্গ এবং পিটসবার্গ, পেনসিলভিনিয়ার নর্থ শোর কানেক্টর সুড়ঙ্গ।
সেতুর বদলে সুড়ঙ্গ নির্বাচনের অন্যান্য কারণ হলো বন্যা, আবহাওয়ার বাধা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য, নির্মাণের সময় চলাচলের জন্য(চ্যানেল সুড়ঙ্গে ৫১.৫ কিলোমিটার বা ৩২ মাইল), সৌন্দর্যের বিবেচনায় (ভূমির উপরের দৃশ্য ও সৌন্দর্য বজায় রাখার জন্য) এবং ওজন ধারনক্ষমতার জন্যেও।
কিছু পানি পারাপার পথ সেতু ও সুড়ঙ্গের সমন্বয়ে তৈরি। যেমন: ডেনমার্ক থেকে সুইডেন সংযোগ এবং ভার্জিনিয়াতে চেসাপিক বে সেতু-সুড়ঙ্গ।
সুড়ঙ্গের কিছু ঝুঁকি রয়েছে,বিশেষত গাড়ির জ্বালানি জ্বলনের পর যে ধোঁয়ার সৃষ্টি হয় তা লোকদের শ্বাসরোধ করতে পারে, যেমনটি ঘটেছিল ২০০১ সালে সুইজারল্যান্ড এর গোটহার্ড রোড সুড়ঙ্গে। বলভানো ট্রেন দুর্ঘটনাটি ছিল সবচেয়ে খারাপ ট্রেন দুর্ঘটনা,এটি ১৯৪৪ সালে ইতালির আর্মি সুড়ঙ্গে ট্রেন থেমে থাকার জন্য হয়েছিল যাতে ৪২৬জন যাত্রী মারা যায়। নকশাকারীরা এই ধরনের ঝু্ঁকি কমানোর জন্য জরুরী অবস্থার বায়ু চলাচল ও প্রধান সুড়ঙ্গের সাথে একটি বের হওয়ার পথ বানিয়ে থাকেন।
সুড়ঙ্গ নির্মাণে অনেক সময় সরকারের তহবিল প্রয়োজন হয়। [৫] সুড়ঙ্গ নির্মাণের যখন পরিকল্পনা করা হয় তখন সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাজনীতি ও অর্থনীতি গুরুত্ব বহন করে। সিভিল ইন্জিনিয়াররা স্থাপনা নির্মাণে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট পদ্ধতি অবলম্বন করেন। কার্য পরিকল্পনায় কাজের সময় নির্ধারন ও জনবল ও উপাদানের পরিমাণ নির্ণয় খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। খনন করার স্থান ও বিভিন্ন যন্ত্র সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে হবে।
সুড়ঙ্গের মতো যেকোন স্থাপনার ব্যয় ও এ থেকে আয় এর পরিমাণ নির্ণয় করতে হবে। রাজনৈতিক কলহ সৃষ্টি হতে পারে,যেমন ২০০৫ সালে ইউএস হাউজ অফ রিপ্রেজেনটেটিবস ১০০লক্ষ ডলারে একটি সুড়ঙ্গ নির্মাণে রাজি হয়। কিন্তু নিউইয়র্ক এর পোর্থ অথোরিটি এই বিষয়ে জানত না। [৬] অতিরিক্ত শুল্ক যুক্ত এধরনের কাজে বৈপরিত্যও সৃষ্টি হতে পারে। [৭]
সুড়ঙ্গ খননে মূলত নানা যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়। যন্ত্রপাতিগুলো মূলত নরম কাদা ও শক্ত পাথর অনুসারে ভিন্ন হয়। সুড়ঙ্গ নির্মাণের প্রক্রিয়া নানা বিষয়ের উপর নির্ভর করে,যেমন:ভূমির অবস্থা,ভূমির নিচের পানির উচ্চতা,সুড়ঙ্গের প্রস্থ ও দৈর্ঘ্য,সুড়ঙ্গের আকৃতি। তিন ধরনের সুড়ঙ্গ নির্মাণ প্রক্রিয়া বহুল প্রচলিত।
কাট এবং কভার হলো সাধারন সুড়ঙ্গ নির্মাণ প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ায় কোন খাই এর উপর ছাদ থাকে যেটিকে বহন করার জন্য নিচে পিলার থাকে। কাট এবং কভার এর দুটি নির্দিষ্ট নিয়ম বা পদ্ধতি রয়েছে:
ভূমির সাথে ঠেস দিয়ে একটি গর্ত খনন করা হয়,সুড়ঙ্গটি এই গর্তের ভেতর তৈরি করা হয়। গর্তটি পরে সাবধানে পূরণ করা হয় ও ভূমিটি পুনরায় বহাল হয়।
স্লারি ওয়ালিং বা কনটিগাস বোরড পাইলিং পদ্ধতিতে ভূমি হতে পার্শ্ব ঠেক দেয়াল ও ক্যাপিং বিম নির্মাণ করা হয়। তারপর সরু খনন করা হয় যাতে পূর্বে নির্মিত বিম বা কনক্রিটের উপর সুড়ঙ্গ ছাদ তৈরি করা যায়। তারপর ভূমিটি প্রবেশেথ বাদে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা হয়। এতে তাড়াতাড়ি সড়কপথ, বিভিন্ন ব্যবস্থা ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য চালু হতে পারে। তারপর স্থায়ী সুড়ঙ্গ ছাদের নিচে খনন কাজ চালানো হয়, এবং ভূমির ফলক নির্মাণ করা হয়।
অগভীর সুড়ঙ্গগুলো মূলত কাট এবং কভার দ্বারা করা হয়(যদি পানির নিচে, ভাসমান নলের মতো হয়), যেখানে গভীর সুড়ঙ্গগুলো খনন করা হয় একটি সুড়ঙ্গ করার ঢাল ব্যবহার করে। মধ্যবর্তী পদের জন্য উভয় প্রক্রিয়া ব্যবহার করা যায়।
বড় কাট এবং কভার বাক্সগুলো অনেকসময় ভূগর্বস্থ মেট্রো স্টেশনগুলোতে ব্যবহার করা হয়, যেমন লন্ডনে ক্যানারি হুয়ার্ফ টিউব স্টেশনে।
কাট এবং কভারের একটি বড় অসুবিধা হলো,নির্মাণের সময় ভূপৃষ্ঠে ব্যাপক ভাঙ্গন হয়। এটি এবং বৈদ্যুতিক আকর্ষণের জন্য ১৯শতকের শেষের দিকে লন্ডন আন্ডারগ্রাউন্ডের সুইচ গভীর স্তরে সুড়ঙ্গ খনন করতে সক্ষম হয়।
খননকারী যন্ত্র মূৃলত টিবিএম (সুড়ঙ্গ খননকারী যন্ত্র - টানেল বোরিং মেশিন) হিসেবে পরিচিত। সুড়ঙ্গ তৈরির কাজকে স্বয়ংক্রিয় করতে খননকারী যন্ত্র ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয় যা সুড়ঙ্গের ব্যয় কমিয়ে দেয়। কিছু প্রধান শহুর জায়গাতে, রেল ও রাস্তা বসানোর বিকল্প হিসেবে সুড়ঙ্গ খননকে দ্রুত ও ব্যয় সাপেক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় ব্যয়বহুল দালান ও ভূমি কেনার বাধ্যতার সাথে, সম্ভাব্য সুদীর্ঘ পরিকল্পনার অনুসন্ধান বাতিল হয়।
ফেব্রুয়ারি ২০১০ সালে, আকার উইর্থ ক্যান্টন অফ গ্লোরাসে লিনথালের দক্ষিণে অবস্থিত লিন্থ-লিম্মার্ন পাওয়ার স্টেশন সম্প্রসারণ করার জন্য একটি টিবিএম সুইজারল্যান্ডে প্রেরণ করেন। খননকৃত গর্তটির ব্যাস ৮.০৩ মিটার (২৬.৩ফুট)। [৮] সুইজারল্যান্ডে ৫৭ কিলোমিটারের (৩৫ মাইল) গোটহার্ড বেস সুড়ঙ্গটি খননের জন্য যে চারটি টিবিএম ব্যবহার করা হয়েছিল সেগুলোর ব্যাস ছিল ৯ মিটার (৩০ ফুট)। নেদারল্যান্ডসের এইচএসএল-জুইড এর অংশ হিসেবে গ্রীণ হার্ট সুড়ঙ্গ (ডাচঃ টানেল গ্রোয়েনে হার্ট) খননের জন্য একটি বৃহত্তর টিবিএম নির্মাণ করা হয়,যেটির ব্যাস ছিল ১৪.৮৭মিটার (৪৮.৮ফুট)। এই সবগুলো যন্ত্রের বেশিরভাগ তৈরি করেছে হেরেনকনেচ (ইংরেজিঃ Herrenknecht)।
বার্থা টানেল বোরিং মেশিন পৃথিবীর বৃহত্তম এই প্রজাতির মেশিন। ব্যাস ১৭.৫ মিটার। ওয়াশিংটন রাজ্য পরিবহন দপ্তরের অন্তর্গত দ্বি-স্তরীয় আলাস্কান ওয়ে ভায়াডাক্ট প্রতিস্থাপন টানেল তৈরিতে নির্মাণ করা হয়েছিল। মেশিনটি তৈরী করে জাপানের ওসাকা শহরের হিটাচি জোসেন কর্পোরেশন।
ক্লে কিকিং হলো শক্ত কাদাযুক্ত মাটিতে সুড়ঙ্গ খননের জন্য যুক্তরাজ্য দ্বারা তৈরি একটি বিশেষ পদ্ধতি। পূর্বের হস্তচালিত কুড়াল ব্যবহার যেগুলো শক্ত মাটির উপর নির্ভর করতো তার বিপরীতে, ক্লে কিকিং মূলত নীরব পদ্ধতি এবং নরম মাটির কোন ক্ষতি করেনা। যন্ত্রটি চালানো, কিকারটি মাটির একটি অংশ নিষ্কাশন করে, যেটিকে তারপর বাতিলকৃত নিষ্কাশনে রাখা হয়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়, জার্মান সাম্রাজ্যেরর নিচে মাইন রাখার জন্য রয়েল ইঞ্জিনিয়ার টানেলিং কোম্পানিসস এই পদ্ধতি ব্যবহার করেছিল। এই পদ্ধতিটি অনেকটাই নীরবে হয় তাই শোনার মাধ্যমে সনাক্তকরণ প্রক্রিয়ায়য় এটি সংবেদনশীল। [৯]
নিউ অস্ট্রিয়ান টানেলিং মেথড(এনএটিএম) ১৯৬০এর দশকে আবিষ্কৃত হয় এবং এটি খুবই জনপ্রিয় ইঞ্জিনিয়ারিং প্রক্রিয়া যেটি সুড়ঙ্গ তৈরিতে নিরাপদ ঠেক প্রধানের জন্য গাণিতিক ও পরিক্ষামূলক মাপ ব্যবহার করে থাকে। এই পদ্ধতির প্রধান ধারণা হলো চারদিকের পাথরের ভরের ভূতাত্ত্বিক চাপকে কাজে লাগিয়ে সুড়ঙ্গকে স্থির রাখা। ভূতাত্ত্বিক মাপজোখের উপর নির্ভর করে একটি আড়াআড়ি অংশ নির্ধারন করা হয়। খনন কাজটি ছড়ানো কনক্রিটেরর স্তর দ্বারা সুরক্ষিত থাকে যাকে শটক্রিট বলা হয়।
পাইপ জ্যাকিং পদ্ধতিতে,হাইড্রোলিক জ্যাক ব্যবহার করে বিশেষভাবে তৈরি একটি পাইপকে মাটির ভেতর দিয়ে প্রবেশ করানো হয়। এই পদ্ধতিটি সাধারণত কোন বিদ্যমান স্থাপনার নিচ দিয়ে সুড়ঙ্গ তৈরি করতে ব্যবহার করা হয়,যেমন:রাস্তা ও রেলপথ। পাইপ জ্যাকিং দ্বারা নির্মিত সুড়ঙ্গগুলো মূলত ছোট ব্যাসের হয় যার সর্বোচ্চ আকার ৩.২মিটার(১০ফুট) হয়।
বক্স জ্যাকিং অনেকটা পাইপ জ্যাকিং এর মতো,কিন্তু পাইপ বা টিউবের জায়গায় এ পদ্ধতিতে বাক্স আকৃতির একটি সুড়ঙ্গ ব্যবহার করা হয়। বক্স জ্যাকের বিস্তার পাইপ জ্যাকের থেকে বড় হয়,কিছু বক্স জ্যাকের বিস্তার ২০মিটার(৬৬ফুট) হয়।
নির্মাণকাজ শেষ হয়ে গেলে নির্মাণেরর জন্য তৈরি করা পথটি বায়ুচলাচলের পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আবার জরুরী অবস্থায় বেরনোর পথ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
সুড়ঙ্গ তৈরির সময় একটি অস্থায়ী রাস্তাও তৈরি করা হয়। এই রাস্তাতে রেললাইনের ব্যবস্থা করা হয়। এই লাইন দিয়ে খননের ধ্বংসস্তুপ সরিয়ে ফেলা হয়। স্থায়ী রাস্তা তৈরি করা শেষ হলে এই অস্থায়ী রাস্তা বন্ধ করে দেয়া হয়।
যানচলাচলের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে সুড়ঙ্গকে পরিবর্তনন বা পরিবর্ধন করতে হতে পারে:
ডুবন্ত সুড়ঙ্গ বানানোর বিভিন্ন চেষ্টা করা হয়েছে,এর মধ্যে খনন কৃত সবচেয়ে জনপ্রিয় দুটি খননকৃত সুড়ঙ্গ বা ডুবন্ত নল হলো জোবরিকা সুড়ঙ্গ ও মারমারে। বিবেচনাধীন এমন একটি বড় উদ্যোগ হলো ডুবন্ত ভাসমান সুড়ঙ্গ যদিও বর্তমান সময়ে এমনকোন সুড়ঙ্গ তৈরি হয়নি।
একটি দালানের গর্তে মূলত অনুভূমিক ও উলম্ব সীমানা থাকে যা ভূগর্ভস্থ পানি ও মাটিকে গর্তের বাইরে থাকে। (অনুভূমিক ও উলম্ব) দালানের গর্ত সীমানার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সম্ভাব্য বিকল্প এবং সমাহার রয়েছে। কাট এবং কভারের সাথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো খোলা দালানের গর্ত সুড়ঙ্গ নির্মাণেরর পর লুকায়িত হয়ে যায়; কোন ছাদ সেখানে দেয়া হয় না।
কিছু সুড়ঙ্গ দু'তলার হয়, যেমন স্যান ওয়াকল্যাণ্ড বে সেতুর দুটি প্রধান অংশ যার্বা বুয়েনা আইল্যান্ডের মধ্যে একটি ৫৪০ফুট(১৬০মিটার) সুড়ঙ্গের সাথে সংযুক্ত হয়েছে, যেটি পৃথিবীর খনন করা সবচেয়ে বড় ব্যাস বিশিষ্ট সুড়ঙ্গ। [১৪] নির্মাণের সময় এটির নিচের তলায় বিপরীতমুখী রেল ও ট্রাকের পথ ছিল ও উপরের তলা ছিল অটোমোবাইলের জন্য, বর্তমানে এটির উভয় তলাকে একমুখী সড়ক যানের পথ হিসেবে রূপান্তর করা হয়েছে।
তুর্কিতে, বসফোরাসের নিচে ইউরেশিয়া সুড়ঙ্গটি ২০১৬সালে চালু হয়। এটির ভেতর ৫.৪কি.মি.(৩.৪মাইল) এর দু'তলা রাস্তা রয়েছে যার প্রতি তলায় দুই লাইনের রাস্তা রয়েছে। [১৫]
আরও ২০১৫সালে তুর্কিশ সরকার ঘোষণা করে যে তারা পৃথিবীর প্রথম তিনতলা সুড়ঙ্গ তৈরি করবে যেটিও বসপোরাসের নিচে হবে। [১৬] সুড়ঙ্গটি ইস্তানবুল মেট্রো ও দু'তলা হাইওয়ে উভয়টি বহন করার কথা, এটি দৈর্ঘ্যে ৬.৫কি.মি.(৪.০মাইল) থেকে বড় হবে।
পশ্চিম প্যারিসে দ্যা ফ্রেঞ্চ এ৮৬ ডুপ্লেক্স সুড়ঙ্গটি মূলত দুটি খননকৃত টিউব সুড়ঙ্গের সমন্বয়ে তৈরি, পশ্চিমেরটি যেটি হালকা মটরযান গুলোর জন্য দুটি তলা রয়েছে সেটি দৈর্ঘ্যে ১০কি.মি. (৬.২মাইল)। যদিও প্রতিটি তলার গাঠনিক উচ্চতা ২.৫৪ মিটার (৮.৩ ফুট), এই টিউব সুড়ঙ্গে শুধু ২ মিটার (৬.৬ ফুট) লম্বা যান অনুমোদিত, আর মটরসাইকেল চালকরা অন্য সুড়ঙ্গ দিয়ে যায়। প্রতিটি তলা তিন সারির রাস্তা দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল, কিন্তু প্রতিটি তলার দুটি সারিই ব্যবহৃত হয়, তৃতীয়টি সুড়ঙ্গের মধ্যে শক্ত কাঁধ হিসেবে কাজ করে। এ৮৬ ডুপ্লেক্স হলো ইউরোপের দু'তলা সবচেয়ে লম্বা সুড়ঙ্গ।
যুক্তরাজ্যে, ১৯৩৪সালে লিভারপুল ও বার্কেনহেডের মধ্যে মার্সে নদীর নিচে কুইনসওয়ে সুড়ঙ্গটির উপরের তলায় যানবাহন ও নিচের তলায় ট্রাম চলার কথা ছিল। নির্মানের সময় ট্রামের ব্যবহার বাতিল হয়ে যায়। নিচের অংশটি শুধুমাত্র তার, নালি এবং বিপদের সময় আশ্রয়স্থান হিসেবে কাজ করে।
হংকং এর লায়ন রক সুড়ঙ্গ ১৯৬০এর মাঝের দিকে নির্মাণ করা হয়, যা নিউ কওলুন ও শা টিন কে যুক্ত করে। এটি মটরগাড়ি বহন করার পাশাপাশি জলনালি হিসেবে কাজ করে। সুড়ঙ্গের রাস্তার নিচে অবস্থিত এটির একটি গ্যালারিতে পানির পাঁচটি প্রধান নালি রয়েছে যেগুলোর ব্যাস ১.২মিটার-১.৫মিটার। [১৭]
সাধারণ ইউটিলিটি নালা বা সুড়ঙ্গগুলোতে থাকে দুই ততোধিক ইউটিলিটি সুড়ঙ্গ। বিভিন্ন ইউটিলিটি সুড়ঙ্গকে এক সুড়ঙ্গে স্থাপনের মাধ্যমে, সংস্থাগুলো ইউটিলিটি নির্মাণ ও মেরামত খরচ হ্রাস করতে পারেন।
মাঝেমাঝে ইট কিংবা স্টিল দিয়ে রাস্তা,নদী,রেলপথ আচ্ছাদিত করে ওভার ব্রিজ তৈরি করা হয় এবং তারপর সেটির পৃষ্ঠ ভূমির সাথে মিলিয়ে দেয়া হয়। রেলওয়ে অনুসারে,সমতল একটি পথ যেটি বানানো হয়েছে বা আচ্ছাদিত করা হয়েছে সাধারণত "আচ্ছাদিত পথ" হিসেবে পরিচিত।
তুষার চালা হলো একধরনের কৃত্রিম সুড়ঙ্গ যেটি রেলপথকে তুষার হিমবাহ থেকে রক্ষা করতে তৈরি করা হয়। একইভাবে স্ট্যানওয়েল পার্ক,নিউ সাউথ ওয়েলস "স্টিল সুড়ঙ্গ",ইল্লাওয়ারা রেলওয়ে লাইন রেলপথকে পাথরপতন থেকে রক্ষা করে।
খননের কাজে সুড়ঙ্গের ব্যবহার ড্রিফট মাইনিং হিসেবে পরিচিত।
কিছু সুড়ঙ্গ একদম পরিবহনের জন্য তৈরি করা হয় না বরং সেগুলো দুর্গ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যেমন: মিটেলওয়ের্ক এবং ছেয়েন্নে মাউন্টেইন কমপ্লেক্স। সামরিক সশস্ত্র সংঘর্ষে ব্যবহার বা বেসামরিক আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য বিভিন্ন খনন ও মাটির নিচে আশ্রয়স্থান তৈরি করা হয়। সুড়ঙ্গের সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যবহার ছিল রাসায়নিক অস্ত্র ভান্ডার হিসেবে সুড়ঙ্গের ব্যবহার।
মটরগাড়ির সুড়ঙ্গগুলোতে নিয়মমাফিক বায়ুচলাচলের জন্য পথ ও যান্ত্রিক পাখা থাকে যা ক্ষতিকারক গ্যাসকে সুড়ঙ্গের বাইরে বের করে দেয়।
রেল সুড়ঙ্গগুলোতে মূলত প্রতি ঘণ্টায় বাতাস পরিবর্তনের প্রয়োজন হয় না তবুও বাতাস যাতায়াতের পথের প্রয়োজন হতে পারে। উভয় ধরনের সুড়ঙ্গে বিপজ্জনক পরিস্থিতির জন্য বাড়তি বাতাস যাতায়াতের পথ থাকতে পারে,যেমন:অগ্নিকান্ড। যদিও বেশি বাতাস প্রবাহের জন্য জ্বলনের পরিমাণ বৃদ্ধির একটি ঝুঁকি থাকে,এক্ষেত্রে মূল লক্ষ্য থাকে অগ্নিনির্বাপনকারীদের পাশাপাশি সুড়ঙ্গে আটকে পরা মানুষদের শ্বাসযোগ্য বাতাস যোগান দেওয়া।
সমান্তরাল ও আলাদা একটি সুড়ঙ্গ থাকলে সাধারণত একটি বায়ুবন্ধ,খোলা জরুরি অবস্থার দরজার ব্যবস্থা থাকে। এটি মূলত ধোঁয়াভর্তি সুড়ঙ্গ থেকে অন্য সুড়ঙ্গে বের হয়ে যেতে আটকে পড়া মানুষদের কাজে লাগে।
গোপন সুড়ঙ্গগুলো এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পালিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়। যেমন;চু চি সুড়ঙ্গ ও গাজা স্ট্রিপ সুড়ঙ্গ যেটি মিশরের সাথে যুক্ত হয়েছে। স্নায়ুযুদ্ধেও গোপন সুড়ঙ্গ ব্যবহার করা হতো।
পাচারকারীরা অবৈধ অস্ত্র ও মাদক পাচার করার জন্য গোপন সুড়ঙ্গ তৈরি করে। মেক্সিকো-যুক্তরাষ্ট্র সীমান্তে ১০০০ফুটের একটি সুড়ঙ্গ পাওয়া যায় যেটি মাদক পাচারে ব্যবহার করা হতো। এটি নির্মাণ করতে ৯মাস লাগে ও ১০লক্ষ টাকা খরচ হয়। চোরেরাও ব্যাংক বা বাসায় অনুপ্রবেশের জন্য গোপন সুড়ঙ্গ ব্যবহার করে। সীমান্ত রক্ষীদের দ্বারা এসকল গোপন সুড়ঙ্গ ধরা পড়ে,যেমন:ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত ও জাম্মু-কাশ্মীর সীমান্তের গোপন সুড়ঙ্গ।
|ইউআরএল=
এর মান পরীক্ষা করুন (সাহায্য)। Daily Sabah।